.
ছবিটা শিকাগোর, ১৯৪৮ সালের। বসে থাকা বাচ্চাদের নাম লেনা, রেই, মিল্টন আর স্যু এলেন। লজ্জায় আর শোকে হাত দিয়ে মুখ লুকিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি তাদের মা লুসিলা। তখন সারা দুনিয়ায় চলছিলো ১৯২৯ সালে শুরু হওয়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, যা Great Depression নামেও পরিচিত। এর ভুক্তভোগী ছিলো প্রধানত ইউরোপিয়ান দেশগুলো। লুসিলা অথবা রে' পরিবারের মতো এরকম অনেক পরিবারের অবস্থা তখন এমনই এমনকি আরো করুণ হয়েছিলো। অবশ্য এই ছবিটা ডিপ্রেশানের একদম শেষের দিককার, যখন পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গিয়েছিলো। তাহলে শুরুর দিকের অবস্থা কেমন ছিলো। আপনি তো এখন এই দেশগুলো প্রদত্ত 'উন্নয়ন' এর গ্ল্যামারাস বুলি আর ফাঁকিবাজি অর্থনৈতিক পলিসিগুলোর মোহে আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন। শুরু থেকেই এসবের ভুলত্রুটি আর গাধামির খেসারত যে পরিমাণ Human-cost ছিলো, সেটা আপনার কল্পনাতেও আসবেনা। তা-ও বিখ্যাত ঔপন্যাসিক John Steinbeck তার বিখ্যাত উপন্যাস The Grapes of the Wrath এ তুলে ধরার কিছুটা চেষ্টা করেছেন, দেখতে পারেন।
.
যাইহোক, এখন চলেন, গত শতাব্দীর ডমিন্যান্ট দুইটা অর্থনৈতিক ডকট্রিনের সাথে দেখা করে আসি। বিশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক স্কুল অব থট গুলোর মধ্যে প্রভাবশালী একটা স্কুল ছিলো 'লেইসে-ফেয়ার (Leissez-Fair)'। এই লেইসে-ফেয়ার স্কুল ছিলো দরিদ্র এবং খেটে খাওয়া মানুষদের স্বার্থবিরোধী আরো যত সব পলিসির জন্মদাতা। সেগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে Pareto Optimality থিওরি। Pareto Optimality/Pareto Efficiency বলে- ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ নিয়ে ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে পূনর্বন্টন করা হলে কোনো ভালো ফলাফল আসবে কী না- সেটা নিশ্চিত না। কারণ কী? কারণ হচ্ছে- "একজন ধনী ব্যক্তির এক কাপ মদ পানের মাধ্যমে যে উপযোগিতা অর্জন হয়, সেটা একজন দিনমজুরের এক টুকরো পাউরুটি খাওয়ার মাধ্যমে প্রাপ্ত উপযোগিতার চাইতে অনেক বেশি হতে পারে।" খেয়াল রাখবেন, এখানে কিন্তু ভ্যালু জাজমেন্ট দেয়া হচ্ছে না। বরং উদ্দেশ্য এটা দেখানো যে, লেইসে-ফেয়ার ইকোনোমিক্স এমন এক ধারণা যেখানে মার্কেট আউটকামকে সমাজের সর্বোচ্চ এফিশিয়েন্সির মানদন্ড হিসেবে দেখানো হয়। ফলাফল? ইতিহাস খুলুন।
.
কিন্তু এই চিন্তার গাধামি মানুষের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে ১৯২৯-১৯৩০ (যার প্রকৃত ব্যাপ্তিকাল ছিলো মোটামুটি ১৯২৯ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত) সালের Great Depression এর মাধ্যমে। তখন ফ্রি-মার্কেটের ফাংশান একটা গণ-বেকারত্ব সৃষ্টি করেছিলো ইউরোপে। উপার্জন হারিয়ে খেটে খাওয়া শ্রমিকদের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া সৃষ্টি করেছিলো এক ভয়ঙ্কর মানব-সঙ্কট। এই গ্রেইট ডিপ্রেশানে সীমাহীন মানবক্ষতি হলেও এটা ছিলো অসহায়, দরিদ্র মানুষদের জন্য একটা আদর্শিক বিজয় বটে। কীভাবে? এই ক্যাপিটালিস্টিক সিস্টেমের আগা-গোড়া তার সূচনাকাল থেকেই সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী। এখানে কখনোই মানুষের মঙ্গল চিন্তা করে কাজ হয় না। সমাজের গুটিকয় মানুষের হাতে সর্বময় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে বাকিদের শোষন করার তন্ত্র এটা। সেই ক্যাপিটালিস্টিক সিস্টেমের এই মুক্তবাজার অর্থনীতি যে সমাজের মানুষদের খাদ্য আর কর্মের যোগান দিতে বরাবরই অক্ষম- এই Great Depression এর মাধ্যমে সেটা সবার সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। আগে এই সিসটেমের কার্যকারীতার স্বপক্ষে এর প্রবক্তাদের গলাবাজি থাকলেও এখন আর বড় গলায় সেই গলাবাজি চালাতে পারবে না। চালাতে হলে তাকে হয় নির্লজ্জ আর নাহয় মিথ্যুক দুইটার একটা হতে হবে।
.
কীনেসিয়ান ( Keynes) অর্থনীতি লেইসে-ফেয়ার ইকোনোমির এই অনিবার্য ব্যর্থতার গর্ভেই জন্ম নেয়া আরেক মতবাদ। কীনেস তার প্রবর্তিত এই স্কুলে ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির শ্রমবাজারের স্বয়ংক্রিয় যোগান-চাহিদার ধারণা অস্বীকার করে বলেন- এই নিয়ম বাজারে শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কাজ করেনা, তাই সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরী। (কীনেসের সরকারপক্ষীয় এরকম অবস্থানের হেতু তিনি পরিষ্কার করেননি। তার এই অবস্থানটা বরাবরই একটা রহস্য থেকে গেছে।)
.
অনেকেই বলেন যে, কীনেস এই তত্ব নিয়ে এমন একটা মুহুর্তে পুঁজিবাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যখন সমাজতন্ত্রের বিপরীতে পুঁজিবাদ তার সর্বদিক হারিয়ে জনগণের মাঝে প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে। এই সঙ্কটকালীন পরিস্থিতি থেকে বের করে আনার লক্ষে তখন তিনি পুঁজিবাদী সরকারগুলোকে একটা এক্সিট-গেইট তৈরি করে দেন, যাতে তারা পুঁজিবাদী কাঠামোর ভেতরে থেকেই শ্রমিকদের জন্য ভিন্ন কোনো উপায় বের করে নিজেদের ইমেইজ এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। এইভাবে কীনেস তখনকার মতো পুঁজিবাদকে তার নিশ্চিত পতনের হাত থেকে উদ্ধার করে।
.
কিন্তু সত্তরের দশকটা ছিলো এই কীনেসিয়ান ডকট্রিন আর লেইসে-ফেয়ার ডকট্রিনের মধ্যে একটা ইঁদুর-বিড়াল খেলার দশক। সে সময় ইউরোপে এনার্জি-ক্রাইসিসের কারণে সৃষ্ট ইনফ্লেইশান কীনেসিয়ান মতবাদের বিপরীতে লেইসে-ফেয়ার অর্থনীতিবিদদের আক্রমণ করার একটা দারুণ সুযোগ এনে দেয়। তারা অনেকটা মাছ ধরার সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকা বকের মতো কীনেসের মার্কেট-ইন্টারভেনশানের ধারণাকে আক্রমণ করে বসে। তারা বলে যে, (এই ইনফ্লেইশান থেকে প্রমাণিত হয়) বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ দরিদ্রদের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাই সেখানে সরকারের হস্তক্ষেপ থাকা ঠিক নয়। তারপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসে রোনাল্ড রীগান আর যুক্তরাজ্যের ক্ষমতায় আসে মারগারেট থ্যাচার। তারা কোনো প্রকারের বাছবিচার ছাড়াই এই সমস্ত লেইসে-ফেয়ার থিওরি বাজারে পুনঃপ্রয়োগ করা শুরু করে।
.
শিকাগো স্কুল অব ইকোনোমিক থটের এই সমস্ত লেইসে-ফেয়ার ইকোনোমির মূল কথা ছিলো ধনিদের হাতে সম্পদ দিয়ে দিলে তারা বেশি বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে, যা সমাজের দ্রুত উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে। আর দরিদ্রদের দারিদ্র অবস্থা যেহেতু শ্রমের মূল্য কমিয়ে আনবে, সেহেতু এটা উৎপাদন বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে। তাই সমাজের দরিদ্র-বান্ধব ওয়েলফেয়ার প্রোগ্রামগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, বিপরীতে ধনিদের শুল্ক এবং অন্যান্য খাজনাসমূহ মওকুফ করে দেয়া হয়েছে।
নিও-ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতির এই তত্বগুলোই আজকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পলিসি তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। এবং এগুলো এমন দেশগুলোতে দিন দিন গৃহহীন আর ক্ষুদার্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করছে, যে দেশগুলো যুদ্ধ আর যুদ্ধ-সরঞ্জামের পেছনেই প্রতি বছর ব্যয় করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার।
.
আমেরিকার কৃষি বিভাগ The United States Department of Agriculture (USDA) জানায় যে, ২০০৯ সালে আমেরিকায় খাদ্য অনিরাপত্তায় ভোগা পরিবারের সংখ্যা ছিলো ১৪.৭ শতাংশ। আর এককভাবে খাদ্য অনিরাপত্তায় ভোগা মানুষের মোট সংখ্যা ছিলো ৫০.২ মিলিয়ন, যার মধ্যে ১৭.২ মিলিয়ন হচ্ছে কেবল শিশু। ১৯৯৫ সালে যখন এই সমস্যা সরকারের প্রথম নজরে আসে, তখন খাদ্য অনিরাপত্তা ছিলো তার সর্বোচ্চ মাত্রায়।
.
আমেরিকার Department of Housing and Urban Development এর বাৎসরিক Houseless Observation Report অনুযায়ী- টানা দুই বছর আশ্রিত গৃহহীন পরিবারের সংখ্যার মাত্রা ছিলো ক্রমবর্ধমান। যে পরিবারগুলোর প্রত্যেকটাতে কমপক্ষে একজন ১৮ বা তদুর্ধ্ব বয়ষ্ক ব্যক্তি এবং কমপক্ষে একজন শিশু রয়েছে। আর আশ্রিত একক গৃহহীন মানুষের সংখ্যা কমছিলো। এই রিপোর্ট অনুসারে- ২০০৯ সালে প্রায় ১০,০৩৫,০০০ মানুষ আশ্রয় অথবা ভাসমান গৃহ ব্যবহার করেছিলো। আর পরিবারের সংখ্যা ছিলো ১৭০,০০০ এর কিছু বেশি, যা ছিলো ২০০৭ সাল থেকে ৩০ শতাংশ বেশি।
এই হচ্ছে উন্নয়নের সর্বোচ্চ শিখরে থাকা দেশটির অবস্থা।
.
আমেরিকার এই গৃহহীন এবং ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি তাদের সম্পদের অভাবে হয়নি। বরং এতোগুলো মানুষ দুর্দশার স্বীকার কেবল তাদের এই সমস্ত বস্তাপচা দর্শনের জন্য। রাষ্ট্রযন্ত্রে যারা বসে আছে তাদেরতো কোনো ক্ষতি হচ্ছেনা। ক্ষতি হচ্ছে নিরীহ প্রজাদের। রাষ্ট্রের চালক আর কুশীলবরা স্রেফ নিজেদের স্বার্থে এই প্রজাদের যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে। তাদের পকেট খরচের টাকাটাও এই প্রজাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম থেকে আসে।
.
এটা শুধু আমেরিকা অথবা ইউরোপের অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রেই না, পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোও- যেখানে এই দেশগুলোকে পরামর্শদাতা মানা হয়, তাদের ডিজাইন করা পলিসি অনুসরণ করা হয়, সব দেশেই একই অবস্থা। সেখানে গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থে সমাজের বাকি সকল মানুষকে সেরেফ একটা মই হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মানুষের ভালো অবস্থায় পৌঁছার জন্য এখানে কোনো ফিকিরই করা হয়না। বরং এইসব মানবীয় এবং পুঁজিবাদী দর্শনের বেঁচে থাকার জন্য মানুষদের এহেন দূর্দশা জিঁইয়ে রাখা তাদের জন্য পরিহার্য। যতদিন পর্যন্ত মানুষ এই ইউরোপিয়ান এবং মানবসৃষ্ট দর্শন ও রাষ্ট্রকাঠামোর ফাঁকিবাজি আর জোচ্চুরি সম্পর্কে সচেতন না হচ্ছে, কথা না বলছে- ততদিন পর্যন্ত অবস্থার পরিবর্তন ঘটবেনা, নতুন ভোরের সূর্যও দেখা হবেনা।
[ Post by : https://m.facebook.com/groups/720400918361221/permalink/1535759666825338/ ]
0 Comments