লাস্ট দুই শতকে ইসলাম সবচে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেসি ডকট্রিন বা উদার গণতান্ত্রিক মতবাদ দ্বারা। যার উৎপত্তি মূলত ক্যাপিটালিজম বা পুজিবাদের বিস্তৃতি এবং তা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে।
পশ্চিম যখন প্রাচ্য থেকে তাদের প্রায় ২০০-২৫০ বছরের দৃশ্যমান ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা গুটিয়ে নিতে শুরু করে তখনই মূলত এর সূত্রপাত। ততদিনে অবশ্য পশ্চিম স্থানীয় নেটিভদের তাদের প্রতিনিধি বানিয়ে ফেলেছে। এবং কলোনি গুলিকে শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে দিয়েছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় প্রায় প্রতিটি কলোনি থেকেই দখলদার পশ্চিমারা একরকম স্বেচ্ছায় ছেড়ে চলে গিয়েছে! এর কারন তারা ততদিনে কলোনি গুলির নিয়ন্ত্রণ অন্য ভাবে করতে শুরু করে দিয়েছে, অর্থাৎ নিজেদের নিয়োগকৃত স্থানীয় নেটিভদের দ্বারা তারা মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে!
তাদের দৃশ্যমান দখলদারিত্ব শেষ হলেও অদৃশ্য ঔপনিবেশকে টিকিয়ে রাখতে মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবেই, তারা দেশে দেশে লিবারেল ডেমোক্রেসি শাসন ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটায়। উদ্দেশ্য কেবল ওই যে পুজিবাদ সেটাই টিকিয়ে রাখা এবং আরও বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃত করা।
লিবারেল ডেমোক্রেসি থেকে লিবারেল বা লিবারেলিজম ধর্মের উৎপত্তি। লিবারেলিজমের আবার কিছু উপশাখাও আছে, যেমন হিউম্যানিজম, সেক্যুলারিজম, ফেমিনিজম, মর্ডানিজম ইত্যাদি।
লিবারেলিজমের মত অন্য কোন ইজম-মতাদর্শ মুসলিমদের ভেতর থেকে এভাবে ধ্বসিয়ে দিতে পারে নাই, যেটা লিবারেলিজম পেরেছে। কারন এই লিবারেলিজমে আছে শুনতে ভাল শোনায় এমন কথিত হিউম্যানিজম! সেক্যুলারিজম! ফেমিনিজম! মর্ডানিজম এর মত কিছু মিছরির ছুরি!! যা মুসলমানদেরকে এমনভাবে দ্বিধাবিভক্ত করে দিচ্ছে যে, সে কখন তার ঈমান হারিয়ে মুরতাদ হয়ে যাচ্ছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
এটা মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে শিকড় গেড়েছে এবং মুসলিমদের মন-মননকে প্রবলভাবে আক্রান্ত করেছে। কুফর/শিরক/নাস্তিকতা সরাসরি জীবন থেকে ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করতে বলে। কিন্তু লিবারেলিজম মুসলিমকে নামে মুসলিম রেখেই ভেতর থেকে পরিবর্তন করে দেবার পন্থা অবলম্বন করে। লিবারেলিজম প্রথমেই যেটা করে তা হলো, এটা আল্লাহর দাসত্ব থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসে মানুষকে তার ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলে!
প্রকৃত অর্থে পৃথিবীর কোনো মানুষ স্বাধীন নয়।
মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যই আল্লাহর গোলামী করা,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
‘আমার এবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা যারিয়াত : আয়াত ৫৬)
ফলে শুরুতেই মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য করে পথভ্রষ্ট করে ফেলছে, এবং মানুষকে তার নফসের গোলামে পরিণত করছে। আর এরপর সেই নফসকে নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য আরও নানান মতবাদ দিয়ে, যেমন হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদ যার মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে সবার উপর নাকি মানব ধর্ম!! তারপর আছে সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানে সকল ধর্মকেই আপনার সমান বলে মেনে নেয়া। অথচ আল্লাহ সুবাহান ওয়া তায়ালা বলছেন,
إِنَّ الدِّيْنَ عِنْدَ اللهِ الْإِسْلاَمُ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটে একমাত্র মনোনীত দ্বীন হ’ল ইসলাম’ (আলে ইমরান ৩/১৯)।
এরপর নারীদের পথভ্রষ্ট করতে নিয়ে আসা হয়েছে ফেমিনিজম বা নারীবাদ, নারীর অধিকারের কথা বলে নারীকে ঘর থেকে বাইরে এনে পুরুষের সমান্তরালে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে!! যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা।
মর্ডানিজম বা আধুনিকায়নের নামে তরুণ প্রজন্ম নির্দ্বিধায় গ্রহণ করছে পশ্চিমের দাসত্ব!
আর এভাবেই মুসলমান নিজেই কখন যে নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে টেরই পাচ্ছে না।
লিবারেলিজমের সবচে বড় সফলতা হলো, ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার কথা টানলে এখন সবার আগে একদল মুসলিমই এর প্রতিপক্ষ হয়ে প্রতিবাদ করে। ফলে যে কাজ আগে কুফফারদের করতে হতো, লিবারেলিজমের সামাজিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেটা নামধারী মুসলিমদের দ্বারাই সম্ভব হচ্ছে।
আর এই টোটাল সবকিছুর উদ্দেশ্য একটাই পশ্চিমের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, পশ্চিমের পুজিবাদের বিস্তার! সারা দুনিয়ার পশ্চিমের শাসন প্রতিষ্ঠা বা নিউ ওয়ান ওয়াল্ড অর্ডার এর ক্ষেত্র প্রস্তুতকরন!
তাদের এই সফলতাকে আমি প্রযুক্তিগত বিভিন্ন সফলতা থেকেও এগিয়ে রাখছি। এটাকে ধ্বসাতে হলে ইসলামের পূর্ণাঙ্গতাকে ব্যাপাকহারে তুলে ধরার বিকল্প নেই। অর্থাৎ এটি নিছক ব্যক্তিগতভাবে পালনীয় কোন দ্বীন নয়, বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এর প্রতিষ্ঠা ও এর আইনের দ্বারা সবকিছু পরিচালিত হলেই কেবল তার পূর্ণ সুফল ভোগ করা সম্ভব।
0 Comments