খামারের জায়গা নিতে চলেছে বিজ্ঞানীর ল্যাব
বিশ্বে খাদ্যশিল্পে কার্বন নিঃসরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে পশুপালন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞানীরা এবং গবেষণাগারে খাদ্য উৎপাদনে বেশি করে এগিয়ে আসা কম্পানিগুলো আশা করছে, পরীক্ষাগারে সেলুলার কালচারের মাধ্যমে খাদ্য তৈরিই এ সমস্যার সমাধান দিতে পারে।
পরীক্ষাগারে শুধু গরুর মাংসই নয়, মাছ থেকে শুরু করে সব ধরনের খাবার উৎপাদনের ব্যাপারেই তারা আশাবাদী। পেরুমল গান্ধী ও তাঁর সহকর্মী জৈব প্রকৌশলী রায়ান পাণ্ডে মিলে ‘পারফেক্ট ডে’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাঁরা শুধু উৎপাদনের জন্য এক ধরনের ফাঙ্গাসের সঙ্গে গরুর ডিএনএর পরিবর্তে গরুর দুধে পাওয়া ‘হুই’ প্রোটিনের জিন সিকোয়েন্স ব্যবহার করেছেন। তাঁরা এসব জিন ওই ফাঙ্গাসের মধ্যে প্রবেশ করান। গাজনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফাঙ্গাস ওই প্রোটিন তৈরি করে। এরপর উৎপাদিত ওই প্রোটিন তরলে পরিণত করে দুধ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি পশুর দুধের বৈশিষ্ট্যের সমতুল্য। এই প্রোটিন থেকে আইসক্রিম, পনিরসহ সব দুগ্ধজাত পণ্যই তৈরি হতে পারে।
পশু পালন না করেই মাংস বা দুগ্ধজাত খাবার উৎপাদনের এই বিকল্প প্রচেষ্টাই সেলুলার কৃষি নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য হলো পশু পালন ও পশু জবাই না করে মাংস, দুধ ও মাংসজাত পণ্য উৎপাদন করা। আর এ প্রক্রিয়ায় খাবার উৎপাদন পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য আরো অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্বে প্রতিবছর ১৪.৫ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসৃত হয় প্রাণিজ খাবারের জন্য। এটি বর্তমানে বিশ্বের সব গাড়ি, উড়োজাহাজ ও জাহাজ যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে তার সমান। বিশেষ করে গরুর মাংস ও দুধ উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়। গরুর পরে সবচেয়ে বেশি দায়ী প্রাণী ভেড়া। তাই সাধারণভাবে বললে, গরু ও ভেড়ার মাংস উৎপাদনের ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ সবচেয়ে বেশি। কার্বন ফুটপ্রিন্ট হলো আমাদের কর্মকাণ্ডে যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসৃত হয়, তার সমষ্টি। মানুষের তৈরি করা উদ্ভিজ্জে খাবারের কার্বন ফুটপ্রিন্ট থাকলেও তার পরিমাণ সবচেয়ে কম। আর প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত খাবারে একদমই নেই। প্রতিদিন প্রতিবেলা পৃথিবীর শত শত কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়াটা একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। আর মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। এই খাবারের জন্য বন উজাড় করে গড়ে তুলতে হয়েছে খামার। বন উজাড় থেকে খাবার পরিবহন ও সংরক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রতিটি পদক্ষেপেই নির্গত হয় কার্বন।
প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে যদি বিশ্ব শূন্য কার্বন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চায় তবে খাদ্যশিল্পকেও অবদান রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় গড়ে ওঠা ‘পারফেক্ট ডে’ ধরনের উদ্যোগই সমাধান হতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য বিজ্ঞানীও একইভাবে গবেষণাগারে মাংস ও দুগ্ধজাত খাবারের অনুকরণ করে অন্যান্য খাবার তৈরি করার আশা করছেন। উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুরের টার্টলট্রি ল্যাবস হলো বিশ্বের প্রথম কম্পানি, যারা দুধ তৈরির জন্য স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে স্টেম সেল ব্যবহার করছে। গাভির প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করতে পারলে আশা করা যায়, মিথেনও কমবে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি গরু বিপুল পরিমাণ মিথেন উৎপন্ন করে। মিথেন সবচেয়ে ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস। দুধ উৎপাদনের মতো প্রাণী কোষ ব্যবহার করে ও বৃদ্ধি ঘটিয়ে গবেষণাগারে মাংস তৈরিতেও একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে বিজ্ঞানী মার্ক পোস্ট বিশ্বের প্রথম গবেষণাগারে তৈরি গরুর মাংসের বার্গার তৈরি করেছিলেন। এটি গরুর পেশি থেকে নেওয়া কোষের কালচার করে তৈরি করা হয়েছিল। মার্ক পোস্ট তাঁর এই উৎপাদনকে ‘খুব ভালো শুরু’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর কথাই পরে সত্য হয়।
মার্কের কম্পানি মোসা মিট এখন এক তিল পরিমাণ কোষের নমুনা থেকে ৮০ হাজার বার্গার তৈরি করতে পারে! একই সঙ্গে ভেড়া ও শূকরের মাংস, মাছ, মুরগিসহ বিভিন্ন প্রাণী থেকে কোষ নিয়ে একইভাবে মাংস তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। গত বছর সিঙ্গাপুর সরকার পরীক্ষাগারে উৎপাদিত মাংস বিক্রির জন্য অনুমোদন দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোষভিত্তিক মাংস উৎপাদন ব্যাপকহারে চালু হলে প্রচলিত মাংসের সমান খরচেই তা উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। প্রযুক্তি ও অভ্যাসগত কিছু অসুবিধা কাটিয়ে ওঠা গেলে অনেক মানুষই ল্যাবে উৎপাদিত খাবার গ্রহণে ইচ্ছুক বলে মনে হয়। যুক্তরাজ্যে চালানো একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটির মোট মাংসের চাহিদার ৪০ শতাংশ পূরণ করতে পারে ল্যাবে উৎপাদিত মাংস।
0 Comments