সেদিন এক দোকানে বই কিনতে গেছি। আপাদমস্তক বোরকা, নিকাবে ঢাকা এক মেয়ে বই কিনতে এসেছে। সে যে বইটা চাচ্ছে সেই নামে একাধিক বই আছে, এখন সে কোন বইটা কিনবে সেটা শিউর হওয়ার জন্য তার স্যারকে ফোন করেছে। খুব সাধারণ কথাবার্তা, এই এই নামের, অমুক লেখকের, অমুক কালারের প্রচ্ছদের বই দেখছি, আপনি যেন কোন বইটা কিনতে বলেছেন - এই সিম্পল কথাগুলোই মেয়েটা ফোনে বলেছে। কিন্তু তার কথা বলার ধরণ আর গলার স্বরের অদ্ভুত পরিবর্তন আর ওঠানামা, বাক্য ব্যয় দেখে মনে হচ্ছিল এক অভিমানি প্রেমিকা তার প্রেমিকের মান ভাঙানোর চেষ্টা করছে। ব্যাপারটা এমন যে সে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে এমনটা করছে, কিন্তু কাজটা যে জায়েয হচ্ছে না, কোনো পরপরুষের সাথে যে এভাবে কথা বলা যায় না, এই উপলব্ধি এই হিজাবি বোনটির মধ্যেও অনুপস্থিত। এখন ফোনের ওপ্রান্তের মানুষটা যতই নিরীহ, সাধু হোক না কেন, সেও তো মানুষ, ফেরেশতা নয়। আল্লাহ কুরআনে নবীপ্রত্নীদের সম্মোধন করে যখন উপদেশ দিয়েছেন তিনি বলেছেন,
.
‘হে নবী পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সঙ্গে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না। ফলে সেই ব্যক্তির মনে কুবাসনা জাগে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে।’ (সুরা-আহযাব, আয়াত-৩২)
.
ইসলাম অন্যসব জীবনবব্যস্থা থেকে নিজেকে আলাদা করেছে কারণ এটি মানুষের জন্য মূল্যবোধ, নৈতিকতা কিংবা মোটের উপর মোরালিটির বাস্তব পাঠ দিয়েছে, যা কেবল কিছু তত্ত্বীয় গঠনতন্ত্রের মতো ব্যাপার নয়। আর ইসলাম নামের এই জীবনব্যবস্থা থেকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয়ভাবে উপকৃত হতে হলে ইসলাম নির্ধারিত মোরালিটির সেসব প্রিন্সিপল জীবনে এপ্লাই করাটা জরুরি।
.
এই আপাদমস্তক বোরকা, নিকাবে ঢাকা এই নারী মনে করছে সে ইসলামের মোরালিটি চর্চা করছে, কিন্তু আদতে তা সে করছে না, বরং সে নিজেই ইটসেলফ আরেকটি স্বতন্ত্র ফিতনার পরিবেশ তৈরি করছে। হিজাব করেও আমাদের বাড়ির মেয়েরা একা একা স্যারের কাছে পড়তে যাচ্ছে, স্যারের সাথে এভাবে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে ফোনে কথা বলছে, সামনাসামনি কথাবার্তার কি অবস্থা আল্লাহু আলেম। ফলে তার এই হিজাব চর্চা এক টুকরো কাপড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ, হিজাবের অন্য যেসব প্রিন্সিপল আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন সে সেসব প্রিন্সিপল চর্চা করছে না, ফলে ঘরে ঘরে হিজাবির সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেটা সত্ত্বেও আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। এটা জাস্ট একটা উদাহরণ। এবার ছেলে-মেয়ে, পরিবার, সমাজ সব ক্ষেত্রে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনগুলোর পোস্টমর্টেম করলে দেখা যাবে আমরা কেউ-ই আসলে ইসলামের সত্যিকারের প্রেসক্রিপশন মানছি না, এমনকি যারা ইসলাম চর্চা করছে বলে মনে হচ্ছে তারাও না। তাহলে যে প্রেসক্রিপশনই আমরা পুরোপুরি মানছি না, সেই প্রেসক্রিপশন থেকে আরোগ্য লাভ করারও তো কথা না।
.
আর তাই গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরে, সিগারেট ফুঁকে, লেটেস্ট মুভি, গানের যাপিত জীবনে যারা ইসলাম দিয়ে সমাজ পরিবর্তন করার আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখেছিল, দেখিয়েছিল - একসময় তাদেরকে দেখেছি কত সহজে দ্বীন থেকেই বেরিয়ে গেছেন। তাদের সেই ইসলাম না পেরেছে তাদের জীবন পরিবর্তন করতে, না পেরেছে সমাজ পরিবর্তন করতে।
.
আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তো নবী হয়েছেন ৪০ বছর বয়সে। কিন্তু নবী হওয়ার আগের ৪০ বছরে তিনি কি করেছেন? উনার কি পরিচয় ছিল? উনার পরিচয় ছিল আল-আমিন, বিশ্বস্ত, আমানতদার, সত্যবাদি, উত্তম চরিত্রের একজন মানুষ হিসেবে। এমনকি উনাকে হত্যা করা হবে এজন্য যখন তিনি মক্কা থেকে মদীনা চলে যাচ্ছিলেন তখনও আলী (রাঃ) কে রেখে গিয়েছিলেন উনার কাছে যারা আমানত রেখেছিল, তা যথাযতভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। সেই রাসূল (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা মোরালিটি চর্চার যে আদর্শ রেখে গেছেন, আবার ইসলামের সেই সোনালী সময়ে প্রত্যাবর্তন সেই মোরালিটি ফিরিয়ে আনা ব্যতীত সম্ভব নয়।
.
এক রামাদানে ইতিকাফ অবস্থায় রাসূল (সাঃ) স্ত্রী সাফিয়া (রাঃ) এর সাথে কথা বলছিলেন, তখন রাত্রিবেলা। দুইজন সাহাবি পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তারা দেখলেন রাসূল (সাঃ) এক নারীর সাথে কথা বলছেন, সেই নারী কে সেটা তাঁরা জানেন না। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) সেই দুই সাহাবিকে ডাকলেন, বললেন তিনি যে নারীর সাথে কথা বলছেন, তিনি তাঁর স্ত্রী সাফিয়া। সাহাবি দুইজন অবাক হয়ে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা কি আপনার সম্পর্কে কোনো খারাপ ধারণা করতে পারি!! রাসূল (সাঃ) বললেন, কিন্তু তোমরা যখন এখান থেকে চলে যাবে তখন শয়তান তোমাদের মনে কুমন্ত্রণা দেবে, নানান খারাপ ধারণা ঢুকিয়ে দেবে।
.
যারা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে, মূল্যবোধ-নৈতিকতা ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখে, তাদের জন্য আবশ্যক হলো ইসলাম যে মোরালিটি চর্চার সীমারেখা টেনেছে, নিজেকে প্রথমে সেই সীমারেখায় শুদ্ধ করে নেওয়া। আর অতীতে ইসলামের যেসব বড় বড় মহান ব্যক্তিদের উদাহরণ আজ আমরা দেখি, তাঁরা নিজেরা যেমন এভাবে ইসলাম থেকে উপকৃত হয়েছেন, সমাজকেও ইসলাম দিয়ে উপকৃত করে গেছেন। আর আজ নানান মত, দল, আদর্শ, তন্ত্রের সাধুরা এক মি-টূ এর কল্যাণে নিজেদের জাত ছিনিয়ে দিচ্ছে।
.
এভাবে পশ্চিমারা তথাকথিত ব্যক্তিস্বাধীনতা দিয়ে মোরালিটিকে রিপ্লেস করে দিয়েছে। ফলে তাঁর আউটপুট হিসেবে চলে এসেছে জিনা-ব্যভিচার, সম-কা-মিতা, এ-ইড-সের মত রোগ, ধর্ষণ, পিতা-মাতাহীন বেনামি বাচ্চা। একটি জরিপ মতে আমেরিকায় ৪০% সন্তান জা-র-জ, সেখানে অবশ্য এসব জা-র-জ-দের ভরণ পোষণের জন্য রাষ্ট্রীয় কিছু ব্যবস্থা আছে।
.
সুতরাং আমরা যদি ইসলামকে আমাদের পরিবারে, সমাজে স্থান দিতে চাই, প্রথমে নিজেদের জীবনে একে স্থান দেওয়াটা জরুরি। নবীজি (সাঃ) বলেছেন, "তুমি আল্লাহকে হেফাজত করো, আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন।" এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ওলামারা বলেন, এখানে আল্লাহকে হেফাজত করার অর্থ আল্লাহর আদেশ নিষেধের হেফাজত করা, আল্লাহর নির্ধারিত সীমার সংরক্ষণ করা। সেটা নারী-পুরুষ সম্পর্ক থেকে সালাত, যাকাত, সাওম সব ক্ষেত্রে। তবে এর বিনিময়ে আল্লাহও আমাদেরকে হেফাজত করবেন।
.
.
কার্টেসিঃ Bujhtesina Bishoyta
পেইজ থেকে সংগৃহীত।।
0 Comments